দিপু সিদ্দিকী ::: ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙা এক জীবন। হাতে ঝুড়ি, মাথায় কাপড়ের পট্টি আর পিঠে দিনের ক্লান্তি নিয়ে তারা ছুটে যান চা বাগানের সবুজে। দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সুবাস যখন শহুরে চায়ের কাপে আভিজাত্য ছড়ায়, তখন সেই সুবাসের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে হাজারো চা শ্রমিক পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। একবিংশ শতাব্দীতেও সিলেটের চা বাগানগুলোতে বসবাসরত হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন আটকে আছে দারিদ্র্য, বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তার এক নির্মম বাস্তবতায়। অথচ এই বঞ্চনার ইতিহাস আজ থেকে প্রায় দুই শতক পুরোনো।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে (১৮৪০-এর দশক থেকে) ব্রিটিশ শাসকেরা আসাম ও সিলেট অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু করে। ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে চা শিল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
সে সময় স্থানীয় মানুষ চা বাগানের কঠিন পরিশ্রমে রাজি না হওয়ায় ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে শ্রমিক আনার কৌশল নেয়। বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, সাঁওতাল পরগনা ও ঝাড়খন্ডের মতো দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা থেকে ‘আড়কাঠি’ (দালাল)-দের মাধ্যমে সহজ-সরল আদিবাসী ও নিম্নবর্ণের মানুষদের প্রলোভন দেখানো হয়। ‘গাছ হিলায়ে গা তো পয়সা গিরেগা’ (গাছ নাড়া দিলেই টাকা পড়বে)- এমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের নিয়ে আসা হয়েছিল এই সিলেটে। কিন্তু এখানে এসে তারা আবিষ্কার করেন এক বন্দি জীবন, যা ছিল দাসত্বেরই নামান্তর।
বাগানের অমানবিক নির্যাতন আর তীব্র বঞ্চনা সহ্য করতে না পেরে ১৯২১ সালে চা শ্রমিকরা নিজেদের মাতৃভূমি বা ‘মুল্লুক’-এ ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চা শ্রমিক নেতা পন্ডিত গঙ্গাচরণ দীক্ষিতের নেতৃত্বে শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো’ (স্বদেশে চলো) আন্দোলন।
১৯২১ সালের ২০ মে প্রায় ৩০ হাজার চা শ্রমিক সিলেট ও আসামের বিভিন্ন বাগান থেকে পায়ে হেঁটে চাঁদপুরের মেঘনা নদীর ঘাটে গিয়ে জড়ো হন। উদ্দেশ্য ছিল জাহাজে করে নদী পার হয়ে নিজেদের আদি ভিটায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু পরদিন, ২১ মে ১৯২১, তৎকালীন ব্রিটিশ গোর্খা সৈনিকেরা চাঁদপুরের স্টিমার ঘাটে নিরস্ত্র, ক্ষুধার্ত ও পরিশ্রান্ত চা শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যে মেঘনা নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে ওঠে। গুলিতে ও মেঘনায় ডুবে প্রাণ হারান হাজার হাজার শ্রমিক। যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের আবার চাবুকের মুখে ফিরিয়ে আনা হয় সেই বন্দি চা বাগানেই।
ইতিহাসের কাকতালীয় এক সংযোগে, চা শ্রমিকদের সেই ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের দিনটির মতোই বিশ্বজুড়ে চা দিবস পালনের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ মে তারিখটিকে। বিশ্বব্যাপী চা উৎপাদক ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং চা শিল্পের টেকসই উন্নয়নকে সামনে রেখেই জাতিসংঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিকভাবে এই দিবসটি পালিত হয়।
২০০৫ সালে প্রথম ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাসহ চা উৎপাদনকারী দেশগুলোর ট্রেড ইউনিয়ন ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগে ১৫ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’ পালন শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে চা শিল্পের গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনা করে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার নেতৃত্বে ২০১৯ সালে দিনটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং উদযাপনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২১ মে। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক এই বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এবং দেশের চা শিল্পের গৌরবময় ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রতি বছর ২১ মে ‘চা দিবস’ উদযাপন করে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট ভ্যালির ২৩টি চা বাগানে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার স্থায়ী এবং ৮ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করছেন। অথচ তাদের দৈনিক হাজিরা মাত্র ১৮৭ টাকা ৪০ পয়সা। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই মজুরিতে পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা।
সরেজমিনে বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ শ্রমিক পরিবার এখনো জরাজীর্ণ টিনশেড কিংবা বাঁশের বেড়ার ঘরে বসবাস করছে। কোথাও ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, কোথাও নেই নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা। বিশুদ্ধ পানির সংকটও ভয়াবহ। পাহাড়ি ছড়া কিংবা অস্বাস্থ্যকর উৎসের পানি ব্যবহার করেই দিনের পর দিন জীবনযাপন করছেন তারা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, কম মজুরির পাশাপাশি অনেক বাগানে নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধেও অনিয়ম রয়েছে। কয়েকটি বাগানে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বেতন বকেয়া থাকছে। এমনকি শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার একমাত্র অবলম্বন প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে। ফলে অবসরে যাওয়া কিংবা অসুস্থ শ্রমিকরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির কার্যকরি কমিটির সভাপতি রাজু গোয়ালা বলেন, ১৮৭ টাকা ৪০ পয়সার হাজিরা দিয়ে এই সময়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব। তার ওপর যদি নিয়মিত বেতন-ভাতা আটকে থাকে এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা না পাওয়া যায়, তাহলে শ্রমিকরা কোথায় যাবে? প্রতি বছর চা দিবস আসে, আলোচনা হয়, কিন্তু চা শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। আমরা অবিলম্বে বকেয়া পরিশোধ ও সম্মানজনক মজুরি নির্ধারণের অন্ততপক্ষে ৪৫০ টাকা দাবি জানাই।
শ্রমিকদের অনেকেই জানান, বংশপরম্পরায় তারা বাগানেই বসবাস করছেন। বাগানের বাইরে তাদের কোনো নিজস্ব জমি বা বিকল্প আয়ের সুযোগ নেই। শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে নতুন প্রজন্মও এই দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে পারছে না। ফলে একটি পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুর স্বপ্নও শেষ পর্যন্ত আটকে যাচ্ছে সেই একই চা বাগানের গণ্ডিতে।
আজ ২১ মে দেশজুড়ে পালিত হবে ‘চা দিবস’। দিবসটি ঘিরে উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির নানা কর্পোরেট আলোচনা হলেও, চা শ্রমিকদের দাবি- কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, চায়ের মূল কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নেই এখন কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। জাতিসংঘের ঘোষিত দিবসের মূল চেতনা ‘শ্রমিক অধিকার রক্ষা’ যেন কেবল কাগজের কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে; বাসস্থান সংস্কার, নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণ, বকেয়া প্রভিডেন্ট ফান্ড পরিশোধ এবং একটি সম্মানজনক দৈনিক মজুরি নির্ধারণের মাধ্যমেই এই বঞ্চনার অবসান চান হাজারো চা শ্রমিক।
Leave a Reply